বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১ বাংলাদেশের প্রথম ভূস্থির যোগাযোগ ও সম্প্রচার উপগ্রহ। এটি ১১ মে ২০১৮ তারিখে কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এটির মধ্য দিয়ে ৫৭ তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের তালিকায় যোগ হল বাংলাদেশ। এই প্রকল্পটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন কর্তৃক দ্বারা বাস্তবায়িত হয় এবং এটি ফ্যালকন ৯ ব্লক ৫ রকেটের প্রথম পেলোড উৎক্ষেপণ ছিল।

স্যাটেলাইট কি ?

স্যাটেলাইট হলো একটি কৃত্রিম বস্তু বা যন্ত্র যা পৃথিবী বা চাঁদ বা অন্য কোনো গ্রহের চারপাশের কক্ষপথে স্থাপন করা হয়ে থাকে। মানুষ দ্বারা নির্মিত হাজার হাজার স্যাটেলাইট পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেরাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট

স্যাটেলাইটের কাজ কি ?

স্যাটেলাইটর কোনোটি বিভিন্ন গ্রহের ছবি সংগ্রহ করে, কোনটি আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়। আবার কোনটি বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আভাস দিতেও সাহায্য করে। কিছু স্যাটেলাইট অন্যান্য গ্রহ, সূর্য, কৃষ্ণবিবর বা দূরবর্তী ছায়াপথ এর ছবি নিতে কক্ষপথে ঘুরে। এছাড়াও এমন কিছু স্যাটেলাইট রয়েছে যারা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মূলত ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
যেমন ইন্টারনেট সংযোগ, টেলিফোন সংযোগ, উড়ন্ত বিমানে নেটওয়ার্ক প্রদান, দুর্গম এলাকায় নেটওয়ার্ক প্রদান, জিপিএস সংযোগসহ বিভিন্ন কাজে কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবহৃত হয়। স্যাটেলাইট বিভিন্ন আকৃতির হতে পারে।

প্রত্যেক স্যাটেলাইটের সাধারনত ২টি অংশ থাকেঃ

১. অ্যান্টেনাঃ তথ্য গ্রহণ ও সংগ্রহের কাজ করে থাকে।
২. শক্তির উৎসঃ সোলার প্যানেল অথবা ব্যাটারি, উভয়ই শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে থাকে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট – ১ এর বিবরণঃ

বঙ্গবন্ধু-১ কৃত্রিম উপগ্রহটি ১১৯.১° ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমার ভূস্থির স্লটে স্থাপিত হয়। এটিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়েছে। ফ্রান্সের থ্যালিস অ্যালেনিয়া স্পেস কর্তৃক নকশা ও তৈরি করা হয়েছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তি মালিকানাধীন মহাকাশযান সংস্থা স্পেস এক্স থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ১৬০০ মেগাহার্টজ ক্ষমতাসম্পন্ন মোট ৪০টি কে-ইউ এবং সি-ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার বহন করবে এবং এটির আয়ু ১৫ বছর হওয়ার কথা ধরা হয়েছে। স্যাটেলাইটের বাইরের অংশে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার রঙের নকশার ওপর ইংরেজিতে লেখা রয়েছে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ সরকারের একটি মনোগ্রামও  রয়েছে সেখানে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট – ১ থেকে ৩ ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবেঃ

১. টিভি চ্যানেলগুলো তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য স্যাটেলাইট ভাড়া করে। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট চ্যানেলের সক্ষমতা বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। আবার দেশের টিভি চ্যানেলগুলো যদি এই স্যাটেলাইটের সক্ষমতা কেনে তবে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। এর মাধ্যমে ডিটিএইচ বা ডিরেক্ট টু হোম ডিশ সার্ভিস চালু সম্ভব।
২. বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মোট ফ্রিকোয়েন্সি ক্ষমতা হলো ১ হাজার ৬০০ মেগাহার্টজ। এর ব্যান্ডউইডথ ও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে ইন্টারনেট বঞ্চিত অঞ্চল যেমন পার্বত্য ও হাওড় এলাকায় ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া সম্ভব। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং সেবা, টেলিমেডিসিন ও দূর নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রসারেও ব্যবহার করা যাবে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট।

৩. বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়ে। তখন এর মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা
চালু রাখা সম্ভব হবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১ কি পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে?

সকল স্যাটেলাইটই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে অর্থাৎ পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে। পার্থক্যটা পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা এবং উপগ্রহটির বেগের ক্ষেত্রে হয়। ২০১৫ সালে বিটিআরসি রাশিয়ার উপগ্রহ কোম্পানি ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে কক্ষপথ (অরবিটাল স্লট) কেনার আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে। কৃত্রিম উপগ্রহটি উৎক্ষেপণ করার পর, বাংলাদেশ ১২ মে ২০১৮ তারিখে এটি
থেকে পরীক্ষামূলক সংকেত পেতে শুরু করে। কৃত্রিম উপগ্রহ সমূহ একই কক্ষপথে থাকে না। পৃথিবী থেকে বিভিন্ন উচ্চতায় বিভিন্ন কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান উপগ্রগুলো একেকটি একেক কাজ সম্পাদন করে থাকে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ বাংলাদেশের প্রথম ভূস্থির যোগাযোগ ও সম্প্রচার উপগ্রহ। এটি ১১ মে ২০১৮ কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ৫৭ তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের তালিকায় যোগ হল বাংলাদেশ। উপগ্রহটি ২৬টি কে-ইউ ব্যান্ড এবং ১৪টি সি ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার সজ্জিত হয়েছে ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার কক্ষপথের অবস্থান থেকে। কে-ইউ ব্যান্ডের আওতায় রয়েছে বাংলাদেশ, বঙ্গোপসাগরে তার জলসীমাসহ ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চল। সি ব্যান্ডেরও আওতায় রয়েছে এই সমুদয় অঞ্চল। পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে এটি সর্বোচ্চ ৩৫৭৮৯.৩ কিমি উচ্চতা এবং সর্বনিম্ন ৩৫৭৯৮.৫ কিমি উচ্চতা সীমায় আবর্তন হয়। এর গতিবেগ ৩.০৭ কিমি/সে।

আরও পড়ুন কম্পিউটার ভাইরাস কি?

প্রযুক্তি