মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমরা অনেকেই সঠিক ভাবে জানি না। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। বর্তমানে আমরা স্বাধীন হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও এই স্বাধীনতার পেছনে রয়েছে দেশের মানুষের বিশাল ত্যাগ। স্বাধীনতার পেছনে থাকে করুণ কাহিনি, নির্মম অত্যাচার, নিপীরিত গল্পগাথা সত্যকারের বাস্তব। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা সংক্ষেপে মুক্তিযুদ্ধ ছিল ১৯৭১ সালে যার শুরুটা হয় ১৯৪৭ সালে।

মুক্তিযুদ্ধ হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান। বর্তমানের বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান। বিভিন্ন অধিকার লড়াই থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, নাগিরত্ব অধিকার পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন সময় সংঘাত হয় পূর্ব পাকিস্তানের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সুচনা থেকে বিজয় পর্যন্ত
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হয়ে নতুন রূপ নেয়। এরপর পাকিস্তান আবার দু’টি ভাগ হয়ে যায় একটি পূর্ব পাকিস্তান অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তান। তারপরেই শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্য দ্বন্দ যার পরিসমাপ্তি হয় ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর।

বিভিন্ন বৈষম্য

১৯৪৭ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান সৃষ্টির সময় থেকে পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত ছিল এবং এই অর্থনৈতিক বৈষম্য পাকিস্তানের শাসনামলে আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। পশ্চিমা শাখায় দেশের রাজধানী এবং অধিক অভিবাসী ব্যবসায়ীর উপস্থিতি হওয়ায় বৃহত্তর সরকারি বরাদ্দকে প্রভাবিত করেছিল। ফলে পূর্ব পাকিস্তান উন্নয়নে বাঁধা হয় তবে এটি কোনো পরিকল্পিত কোনো বাঁধা ছিল না। ডিজিটাল বাংলাদেশ- ২০২১ এর তথ্য জানতে এখানে ভিজিট করুন

পূর্ব পাকিস্তানে দেশীয় ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কম, প্রচুর শ্রমিক অস্থিরতা এবং একটি উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশের তৈরি হয়। কারণ পূর্ব শাখায় বিদেশি বিনিয়োগরা অনেক কম ছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নগর শিল্পের দিকে ছিল। তবে পূর্ব পাকিস্তানের কৃষির উপর অধিক নির্ভরশীল অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত নিয়ে ৪টি প্রদেশ ছিল পশ্চিম। আর পঞ্চম প্রদেশটি ছিল পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের ৭০% এসেছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১১টি পোশাক কারখানা ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল মোট নয়টি।

পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর তুলনায় সংখ্যালঘু ছিল। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় বাঙালি বংশোদ্ভূত অফিসাররা সমগ্র বাহিনীর মাত্র ৫% ছিলেন। মূলত, পূর্ব পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানির তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ন বিপরীত, তাদের কৃষি খাতেও কোনো অধিকার আদায় করতে দেয়া হত না।

জাতি ও সংস্কৃতি

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের সকলেরই জানা থাকা উচিৎ। ১৯৪৭ সালে বাঙালি মুসলিমগণ নিজেদেরকে পাকিস্তানের ইসলামি প্রকল্পের অংশ হিসেবে আবিষ্কার করেন। কিন্তু ১৯৭০ দশকের সময়ে এসে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা নিজেদের বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে ধর্মীয় পরিচয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মত পশ্চিমা মূলনীতির অনুকরনে একটি সমাজ বাস্তবায়নে উদ্যমী হয়ে ওঠে। বহু বাঙালি মুসলিম পাকিস্তানি রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থা মেনে নিতে পরত না। পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণির শাসকগণও এসব মেনে নেয় নি। এভাবে ধীরে ধীরে বিবাদ শুরু হয়। ইসলাম রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানিদের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানিদের অধিক সমর্থন ছিল। এই দুই শাখার মাঝে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পার্থক্য চলে আসে। বাঙালিরা তাদের সংস্কৃতি ও ভাষা, তাদের বাংলা বর্ণমালা ও শব্দগুচ্ছ নিয়ে অনেক গর্ব করায় পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাতদের মধ্য গ্রহণযোগ্য ছিল না। তারা ভাষা নিয়ে অধিক পরিমাণে হিন্দু সাংস্কৃতিক প্রভাব গ্রহণ করেছিল। বাংদেশে সংস্কৃতির বিভিন্ন ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন।

ভাষা আন্দোলন

বাঙালি জাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পশ্চিম পাকিস্তান মেনে নেয় নি। তারপর পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা দেন “উর্দু এবং উর্দুই কেবলমাত্র হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা”। তখন পূ্র্ব পাকিস্তানিরা তা মানতে পারে নি এবং এই ঘটনার তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে বাঙালিরা বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদ জানায়। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পূর্ব পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এর দিকে ধাবিত হয়। ১৪৪ ধারায় ৪ দফা জারি করে। চূড়ান্ত পর্যায়ে এই আন্দোলন তীব্রতম রূপ ধারণ করে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। ঐদিনে বাংলার ছাত্র সমাজ গর্জে ওঠে। তরুনদের সাথে পুলিশের সংঘাত হয় এবং পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরো অনেকে ছাত্র নিহত হয়। পরিষেশে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ১৯৫৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর বৈশ্বিক স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে থাকে।

রাজনৈতিক ও নির্বাচন

পূর্ব পাকিস্তানকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান কুক্ষিগত করে রাখে। তাদের রাষ্ট্রীয় কোনো কাজে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হত না। সরকারী কোনো কাজে অধিকার দেয়া হত না। ব্যাংক সেবা থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনীতেও কোনো অধিকার দেয়া হত না। যখন পূর্ব পাকিস্তানের কোন নেতা (যেমন খাজা নাজিমুদ্দিন, মোহাম্মদ আলী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতেন, তখনই পশ্চিম পাকিস্তানীরা যেকোন অজুহাত দেখিয়ে তাদের পদচ্যুত করতেন। জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা দখল করে নেন। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে পাকিস্তানে তার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চালিয়ে যায়।

যখন ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দল গঠন হয় তখন পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চূড়ান্ত নাটকীয়তার মুখোমুখি হয়। সেই সময় দলটি পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসন হতে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে। ৩১৩ আসনবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এবং তখন আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের অধিকার প্রদান করে। অতঃপর নির্বাচনে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রাপ্ত দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিরোধিতা মত প্রকাশ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কাল রাত
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতকে কাল রাত বা অপারেশন সার্চলাইট বলা হয়। পাকিস্তানির সেনারা প্রায় রাত ১১:৪৫ মিনিটে ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় বিশিষ্ট মানুষের উপর হামলা করে। ঘুমন্ত নিরিহ মানুষের উপর হামলা চালায় যেখানে ছিল-শিক্ষক, ছাত্র, ডাক্তার, বুদ্ধিজীবী সহ সাধারন মানুষ। ৪-৫ ঘণ্ট মধ্য বাংলার মাটিতে রক্তের বন্যা বয়ে যায়।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধ
১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চ রাতের এই হত্যাযজ্ঞের কথা শোনার পর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষনা দেন। তৎকালীন সময়ে তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। এরপর তার নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ হয়। সারা বাংলাদেশে মোট ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়েছিল। তখন বাঙ্গালীদের হাতে যা ছিল তা নিয়েই মুক্তির আশায় যুদ্ধে নেমে যায়।

সেই সময়ে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিল ভারত। ভারতে বাঙ্গালিদের আশ্রয় দিয়েছিল। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর বেলা ২টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর বাংলাদেশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড্ডয়ন করে বিজয় ঘোষনা করেন।

এভাবেই ত্রিশ লক্ষ্য প্রানের বিনিময়ে বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গড়ে।

জাতীয় জাতীয়